মেলায় ভ্রমণ
মেলায় ভ্রমণ
বামাপদগঙ্গোপাধ্যায়।
জানিনা কতটা পথ হাঁটলে তবে মাধুকরী শেষ করা যায়? আমবাগানের ভেতর দিয়ে যেতে যেতে শুকনো ডাল ধরি। পাতা জড়ো করি। মালসা হাতে করে জল আনতে যাই। দেখি সবই পদ্মপাতায় মতো জল টলমল করছে।
ভাবি এই সেদিন কদম্বগাছির কাছে অসীম বৈষ্ণবদের বাটিতে কীর্তন শুনতে গিয়ে শুনলাম মহাপ্রভু নাকি ভাইকে খুঁজতে গিয়ে অনেক পথ হেঁটে ছিলেন। তবে শুনিনি তিনি কোনদিন মাধুকরী করেছেন! আর কত পথ আমায় হাঁটতে হবে? কোথায় গেলে আমার ভ্রমণ শেষ হবে?
এ বড় ধাঁধা। বাউল মন বলে চলো। বোষ্টমী বলে আর গিয়ে কাজ নেই।চলো নাড়া বাঁধি। মাটিতে গর্ত করি তুলসী মঞ্চগড়ি। কিন্তু তুলসী গাছে পাতা হয় না। মন বলে শীতে মেলায় চলো। জয়দেব মেলায়। অষ্টমী বাউল একতারাতে সুর তুলে ছিল : বৃন্দাবনের পথে যাব পথ দেখাবে কে? আহ। ধুলোটের উৎসবে কনকনে হাওয়ায় মামা ভাগ্নে পাহাড়ের ঠান্ডা পাথর পায়ে ছ্যাঁকা মারে। বোষ্টুমকে বলি আর কত পথ।
বলা না বলা কথাগুলো অব্যক্ত রেখে চরাচরে দাপিয়ে বেড়ানো দামাল ছেলেটি আজ পথ খুঁজতে পথে বেরিয়েছে। যাহা খেলে বোচাবুচি চলো হুয়া দেখি যাই। খনির কিশোর গায়ে কালো চাকা চাকা দাগ। দুরন্ত গতিতে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাটি মেখে ফর্সা হয়। কোথায় পাবে সে মুলতানি মাটি? হ্যাঁ গো বোষ্টমী, কুকুরটা যে পিছু ছাড়ে না। কোথায় পাবো রুটি? মাধুকরী করে থলিতে দু একমুঠো চাল ডাল আছে রুটি তো নাই বাপু। যা যা বলে দূরে সরাতে চাইলেও সে আমার পিছু ছাড়ে না। সংসারে লোক বেড়ে যায় গো।
এই ভাবে প্রাণ বাড়ে। বায়ুর মতো বায়ুশূন্যস্থান পূরণ করে।অজান্তে সীমানা পেরিয়ে বয়স চলে যায়। সুখের মানুষ সব ভাসমান। আজকের দিনটা শেষ হলো আম বাগানে। ভাবি কালকে আমার ভ্রমণ কোথায়?
না , দেশ বিদেশে আর যাব না। শীতকাল, মেলায় মেলায় মাধুকরি করে ভ্রমণ করব। সে আবার কী ভ্রমণ কথক ঠাকুর? মেলায় মেলায় ভ্রমণ? বুঝবি না রে বুঝবি না। ভ্রমণ হলো প্রেমের বটের আটা। দেখতে সাদা কিন্ত বড় চটচটে। একবার গায়ে দিলে সে নড়ে বসে না। তুই কেমন করে বুঝবি বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যে হলেই মদের বোতল খুলে বসবি। প্রকৃতি দেখবি কখন? পরের বউকে দেখবি,না নিকষ অন্ধকারে ঝাউ গাছের পাতার সুর শুনবি? তুই থাক। আমি চললুম।
ট্রেন বসে বাউলের গান শুনি : কড়ি নাই যার/
তুমি তারেও কর পার !
আমি দিন ভিখারি নাইকো কড়ি/দেখ ঝুলি ঝেড়ে !
হরি দিনতো গেল সন্ধ্যা হল/পার কর আমারে।
আমায় যেতে হবে কদম্বখন্ডির ঘাটে অজয় নদীর তীরে। ওখানেই আখড়াতে এক কোনে একটু জায়গা করে নেবো। ভান্ডারাতে মাটিতে বসে পাত পেড়ে দুটি অন্ন গ্রহণ।
জীবন সংসারের কুট কাচালি থেকে মুক্ত ।মেলায় মেলায় মানুষের মিলন।মেলায় মানুষ দেখার ভ্রমণ। এই মেলা শেষ হলে যাব মামা ভাগ্নে পাহাড়ে। পাহাড়ের তৃষ্ণা যার মাথায় ঢুকে যায় সে তখন দেখতে পায় আকাশের গায়ে কৃষ্ণনীল উচ্চশির ঢেউয়ের মালা, কোথাও প্রস্তরগাত্র, কোন একটা কোনা থেকে নেমে আসছে ঝরনার ঢেউ। দেবদারু পাইন অর্জুন বিশাল মহিরুহরা আকাশচুম্বী ছায়া নিবিড়তায় দুলছে। পাখিরা গাইছে অসমতলের শুরুর প্রস্তাবনা। এ স্বপ্ন তো বাঙালির স্বপ্ন। দুবরাজপুরের মামা ভাগ্নে পাহাড়ি যাব ধুলোটের উৎসবে। সেখানে নীল আকাশের বুকে অস্থায়ী পাখিরা পাহাড়ের গায়ে এসে ঠোকর মারবে। পাখির সুরে গান হবে। মোহন বাঁশির শব্দ। বাংলাদেশের
বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিম গাইতেন
আমার অনেক বাশের বাঁশি আছে,
মিছে কেন কিনবি চাটাই বাঁশ।।
আমি বারী বাঁশরিয়া
বাঁশি যে মোর প্রাণপ্রিয়া।
বীরভূমের দুবরাজপুরের পাহাড়েশ্বর বা মামাভাগ্নে পাহাড়ের পাশেই দরবেশ পাড়া। এই দরবেশ পাড়াতেই সাধক পুরুষ অটল বিহারী দরবেশের সমাধি। বাংলাদেশের বারী সিদ্দিকীর কথা মনে পড়ে সেই বাঁশীর শব্দ যেন ছড়িয়ে পড়ে দরবেশের সমাধিতে।
প্রতিবছর মাঘ মাসের ৩ থেকে ৫ তারিখ পর্যন্ত এই তিনদিন বসে বাউল গানের আসর। আর এই বাউল গানের আসরে অংশগ্রহণ করেন জয়দেব মেলা ফেরত বাউল শিল্পীরা।জয়দেব মেলা শেষ হলেই বাউল- ফকির ফেরার পথে জমা হন পাহারেশ্বরের পাশে দরবেশ পাড়ায়। এখানেও তিন দিন ধরে চলে বাউল গানের আসর। প্রায় ৫০০ বছর ধরে এই বাউল গানের আসর সেখানে তো একবার যেতেই হয়। মেলায় মিলে প্রাণের ভ্রমণ।
পৌষ সংক্রান্তি। অজয় নদের ঢেউ উল্টোদিকে বইছে কিনা জানিনা। সেটা কবি জয়দেব জানেন। আমার কানে ভেসে আসে দেহি পদপল্লব মুদারম! স্নান সেরে মেলায় যাব।
*




সেরা
ReplyDeleteধন্যবাদ
Deleteলেখাটির মধ্যে নতুনত্ব আছে।সারাজীবন যদি বিভিন্ন জায়গায় নানান ধরনের মেলায় ভ্রমণ করা যায়,তাহলে মন্দ হয় না।
ReplyDeleteDarun darun
ReplyDeleteধন্যবাদ
Delete