তেলিয়াগড়ির দুর্গ

তেলিয়াগড়ির  দুর্গ 

বামাপদ গঙ্গোপাধ্যায় 

ইতিহাস, রাজা, রাজবাড়ী , দুর্গ এইসব শব্দের সঙ্গে বাঙালি এত ভাবে পরিচিত যে এরকম লেখা দেখলেই আর পড়তে ইচ্ছে করে না । না আমি আপনাদের রাজস্থানে নিয়ে যাচ্ছি না । আমি এমন একটা দুর্গে নিয়ে যাব যে দুর্গের সঙ্গে বাঙালির ইতিহাস নানা ভাবে জড়িত । অথচ খুব কম মানুষ আছেন যার সাথে এই দুর্গের পরিচয় আছে । যে দুর্গ বাংলার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতো । তেলিয়াগড়ির দুর্গ জয় করলেই বাংলা জয় করা যেত । সেখানেই আজ আমাদের ভ্রমণ বিচরণ । 


একটু পেছন দিকে যাই । মানে ইতিহাসের পাতায় যাবো ।জানি হলুদ বিবর্ণ পাতা পড়তে ইচ্ছে করে না । তবুও বলি ।

গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজি (পরবর্তীতে হুসামউদ্দিন ইওয়াজ খিলজি বলে পরিচিতি পান) বাংলার শাসক ছিলেন। তিনি ১২০৮–১২১০ সালে এবং পুনরায় ১২১২-১২২৭ সালে দায়িত্বপালন করেন। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজির বিহার জয়কে দিল্লীর   প্রতি হুমকি হিসেবে ধরা হয় এবং দিল্লীর সুলতান ইলতুতমিশ তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১২২৪ সালে ইলতুতমিশ বাংলা আক্রমণ করেন। বিহারের তেলিয়াগড়ে দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি হয়। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজির নৌবাহিনী ও পদাতিক বাহিনী দিল্লীর সেনাদের কাছে পরাজিত হয়। ফলে তিনি ইলতুতমিশকে ৮০,০০,০০০ টাকা ও ৩৮টি যুদ্ধের হাতি প্রদান করেন এবং ইলতুতমিশের নামে মুদ্রা জারি করতে বাধ্য হন। 

কিন্তু ইলতুতমিশের ফিরে যাওয়ার পর গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজি পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর বিদ্রোহ দমনের জন্য বাংলার পূর্বাঞ্চল আক্রমণ করেন। ১২২৬ সালে ইলতুতমিশ পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন ও তাকে পরাজিত করেন। গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খিলজি ও তার সভাসদরা যুদ্ধে নিহত হন এবং বাংলা দিল্লীর  একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

 গুজরাটে হুমায়ুনের ব্যস্ততার সুযোগ নিয়ে শেরখান ১৫৩৫ খ্রিস্টাব্দে ভাগলপুর পর্যন্ত ভূভাগ তার রাজ্যভুক্ত করেন। তারপর তিনি তেলিয়াগড়ে উপস্থিত হন (১৫৩৬ খ্রি.)। এ সময়ে পর্তুগিজদের সহায়তায় মাহমুদের সৈন্য বাহিনী তেলিয়াগড়ি গিরিপথ সুরক্ষিত করে রেখেছিল। তেলিয়াগড় গিরিপথকে দুর্ভেদ্য দেখে শেরখান তার গতিপথ পরিবর্তন করেন এবং অপ্রত্যাশিতভাবে  ঝাড়খন্ডের পথে গৌড়ে উপস্থিত হন। এই দুর্গ নিয়ে 

অনেক রাজ কাহিনী আছে । সেটা লিখলে ইতিহাস লেখা হয়ে যাবে । আমরা এসেছি ভ্রমণ করতে । আর দেখে নেব তেলিয়াগড়ির দুর্গকে । 


সাহেবগঞ্জ রেলস্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন রাত একটা হবে । বাকি সময়টুকু কাটিয়ে দিলাম রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে । সকালে চোখের সামনে ভেসে উঠলো পাহাড় । সবই রাজমহল পাহাড় রেঞ্জ। ওভারব্রিজ পার হলেই পাহাড়ে যাওয়ার রাস্তা । পাহাড়ের উল্টো দিকের রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই গঙ্গা । গঙ্গার ওপারে কাটিহার জেলা । ভোরের ট্রেন ধরে সাহেবগঞ্জের পরের স্টেশন করমটোলা । করমটোলা স্টেশন থেকে লাইন ধরে হাঁটতে হবে দুই কিলোমিটার । লাইনের ধারে পাহাড়ের  মাথায়  রয়েছে তেলিয়াগড়ির দুর্গ । আগেই বলেছি বঙ্গ দেশের মানচিত্র এই দুর্গের একটা আলাদা স্থান ছিল । যে রাজা এই দুর্গকে  দখল করতে পারবেন তিনি রাজত্ব করতেন বাংলায়। জঙ্গলের ভেতর এই দুর্গ বাংলার ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণ করত । পাল বংশ থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের নানা টানাপড়েন দেখেছে । আশ্রয় দিয়েছে বহু রাজাকে । আবার কিছু রাজার মৃত্যুর সাক্ষীও হয়েছে । প্রাচীন দুর্গে  বলা হইত Gate way to Bengal । এক সময় এই গড় ছিল বঙ্গদেশে আজ ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ জেলায় । এই গড়কে কেউ কেউ গড়িদ্বার বলেই জানতেন । গড়িদ্বার কথাটা এসেছে ঘরের দরজা থেকে । চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে  এই গড়ের কথা উল্লেখ করেছেন কৃষ্ণদাস কবিরাজ । মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য এই পথ দিয়ে গমন করেছিলেন । ১৭৫৭ সালে রবার্ট ক্লাইভ এবং বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার মধ্যে পলাশীর যুদ্ধ হয় যেখানে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকের কারণে নবাব যুদ্ধে পরাজিত হন এবং মুর্শিদাবাদ থেকে তেলিয়াগড়ির দুর্গ দিয়ে পাটনার দিকে পালিয়ে যাবার চেস্টা করেন।  সিরাজ-উদ-দৌলাকে মীরজাফরের পুত্র মিরান তাকে ধরে নিয়ে যায় এখান থেকেই। 


 করমতলা স্টেশনে যখন নেমেছি ভোরের আলো পাহাড়ের মাথায় খেলতে শুরু করেছে । আদিবাসী রমণীরা মাথায় কাঠের বোঝা নিয়ে স্টেশনে আসতে শুরু করেছেন । নির্জন স্টেশনে বসে থাকলে নাকি আসে মহুয়ার গন্ধ । জঙ্গল ঘেরা একটা প্রাচীর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দুর্গ । খানিক যাওয়ার পর চোখে পড়ল জঙ্গলে ঘেরা একটা প্রাচীর । পাহাড় ভেঙে দুর্গের রাস্তায় উঠে যাচ্ছে। রেল লাইন সোজা চলে গেছে ভাগলপুর এর দিকে। পাহাড়ের মাথায় খন্ড ঘরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল কেল্লাকে থেকে দেখেছি ঝোপঝাড় আর জঙ্গলের ভেতর থেকে । রেললাইনের ধারে পাহাড়ের মাথায় গড়ের মূল অংশ । বাইরে থেকে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন । ঘুরপথে পাহাড়ের মাথায় পৌঁছলে দেখা যায় বড় থামের মত গোলাকার একটি ঘর ।পিছনে রয়েছে দরজা । দরজা দিয়ে প্রবেশ করলেই দেখা যায় ভিতরে রয়েছে সৈন্যদের পাহারা দেওয়ার গুপ্ত স্থান। বাইরে থেকে দেখা যাবে না কিন্তু সৈন্যরা ভেতর থেকে বাইরের মানুষকে দেখতে পাবে । এরপরই ভেতরে রয়েছে একটা সুরঙ্গ । এই সুরঙ্গ দিয়ে গোপনে মুঙ্গের চলে যাওয়ার রাস্তা ছিল।  ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে একটু এগোলেই দেখা যাবে একটি অক্ষত ঘর। সেই ঘরেই রাজা-মহারাজারা থাকতেন । শাহজাহান নাকি বহুদিন ধরে এই ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। ঘরটা অনেকটা মসজিদের মত রাজাদের ঘর যেমনটি হয় তেমনি কারুকার্য করা ছিল দেয়ালে। কিন্তু আজ আর নেই। চারিদিকে ফাটল রেললাইনের পাশ দিয়ে দেড়শ ফুট লম্বা এবং ১৪ ফুট উঁচু দেয়াল রয়েছে পূর্ব-পশ্চিমে । এই দুর্গ কে বানিয়ে ছিলেন সে বিষয়ে সঠিক তথ্য না পাওয়া গেলেও তেলি জমিদাররা যে বানিয়ে ছিলেন তা ইতিহাস স্বীকৃত । আনুমানিক বারোশো তেরোশো খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটা তৈরি হয়েছিল সেই সময়টিকে মুসলমান শাসনকালে ধরা হয় । যার জন্য তেলিয়াগড়ির  দুর্গে কিছুটা মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়া যায় । দুর্গের পাশেই রয়েছে দুটি স্থান আছে । লোকে বলে এটা নাকি রুক্ষ্মি স্থান ছিল । ইতিহাস বলছে এক সময় এখানে একটি বৌদ্ধ বিহার ছিল ।প্রতি মঙ্গলবার এই রুক্ষ্মি স্থানে ভক্ত মানুষের ভিড় হয় । তিলি জমিদারদের আগেও এই অঞ্চলটি পীঠি রাজ্যের অংশ ছিল ।যার জন্য এখানে একটি স্টেশন আছে পীরপৈতি । তখন রাজত্ব করতেন ছিক্কর বংশের রাজারা। এই ছিক্কর দের গড় ছিলো সাহেবগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে এক কিলোমিটার দূরে ।এই গড়কে শকরুগড় বলা হত । এখানে তৈলা প্রস্থা নাম এক রাজার গড় ছিলো ।  পাল বংশের মহিপাল এখানে একটি গড় তৈরি করেছিলেন। প্রায় তিরিশ বছর মাটি খননের পর ৬০০ গজ  লম্বা একটি টিলার সন্ধান পাওয়া যায় । এই টিলার মধ্যে ছিল একটি মন্দির এই মন্দিরের গায়ে ছিল কালো পাথরের সুন্দর সুন্দর মূর্তি তার মধ্যে বাইশটা মূর্তি রাখা আছে সাহেবগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছে । তেলিয়াগড়ি দুর্গে আছে দাউদ খাঁর সমাধি ও প্রচুর বুদ্ধমূর্তি । জঙ্গলে এদের খুঁজে পাওয়া মুশকিল । বাংলা বিহার যাবার তখন একমাত্র রাস্তা ছিল এই গড়। পাহাড় এবং নদীর মধ্যবর্তী স্থান হবার জন্য সড়কপথেও ছিল সংকীর্ণ । পরবর্তীকালে এই স্থানের নাম হয়েছিল সংকীর্ণ বা শকরু গড় বা শকরিগলি । 

তিলিয়াগড়ি ,শকরিগলি ,পল্টন বাজার এই যাত্রায় দেখে নেওয়া যায়। তারপর চলে আসুন সাহেবগঞ্জ রেলস্টেশন পাশের পাহাড়ে । এই পাহাড়ের মাথায় রয়েছে আদিবাসী গ্রাম । মাটির ঘর জঙ্গল কেটে কিছুটা পরিষ্কার করে ঘর তৈরি হয়েছে । অসাধারণ পরিবেশ । এই পাহাড়ে উঠতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যাবে । পাহাড়ে যে পথ দিয়ে গেছেন নামুন উল্টো দিক দিয়ে । প্রকৃতির রূপে রঙে ভরা পাহাড়ের মাথা থেকে দেখতে পাবেন সাহেবগঞ্জ 

শহরকে । সাহেবগঞ্জে থাকার হোটেল আছে অনেকগুলো । হাতে সময় থাকলে সাহেবগঞ্জ রেলস্টেশনের কাছে রেলের স্কুলে রাখা প্রাচীন মূর্তি গুলো একবার দেখে নিতে পারেন ।

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

রবীন্দ্রনাথ_ইতালি_ভ্রমণ_ও_মুসোলিনি